একটা চলন্ত গাড়িকে হুট করে থামিয়ে দেয়া যায় না। ধাক্কা লাগে। ভীষণ একটা ধাক্কা।
রাস্তার মধ্যে যে গাড়িটা একশো কিংবা তারচে বেশি স্পিডে ছুটে যাচ্ছে। কেউ যদি দুম করে সেই গাড়ির ব্রেক চেপে বসে, তাহলে গাড়ির ভেতরে বাইরে একটা প্রলয় ঘটে যাবে। ঠিক একই অবস্থা ঘটবে বাস, ট্রেন কিংবা দ্রুত গতিতে ছুটে চলা যে কোন কিছুতেই।
লিখতে বসলাম ট্র্যাভেল স্টোরি, কিন্তু, সেই গল্প না বলে বকবক করছি স্পিড নিয়ে। কেনো – সেই ব্যাপারটা আগে বলি।
এবছরের প্রথম দিকে ফ্রেব্রুয়ারি মাসে গিয়েছিলাম কক্সবাজার। প্রায় বারো বছর আগে শেষ গিয়েছিলাম সাগর পাড়ের এই শহরটাতে । তারপর, আর যাওয়া হয়নি।
কিন্তু, এবার মন চাইলো বঙ্গোপসাগরের নোনা পানির ঘ্রাণটা আবারও নিতে।
মন যখন চাইলো, তখন কি আর দেরি করা যায় – না, করা যায় না। আমিও করিনি।
প্লেনের টিকিট করে রোদ ঝলমলে বসন্তের সকালে উড়াল দিলাম আকাশে। মেঘের ভেতর দিয়ে উড়তে উড়তে ঘন্টাখানেকের ভেতর চলে এলাম – কক্সবাজার।
এয়ার ট্র্যাভেলের একটা বিরাট যন্ত্রণা আছে। যখন তখন তামাকের স্বাদ নেয়া যায় না। সেই সকালের নাস্তা সেড়ে একটা সিগারেট খেয়েছিলাম। তারপর আর সুযোগ হয়নি। তাই, এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়েই আরাম করে একটা ধরালাম।
খানিক দূরেই হোটেলের মিনি ট্র্যাভেল বাস দাঁড়িয়ে ছিলো। সময় না হলে ছাড়বে না। আমি ধূমপান সেরে বাসের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ভাবলাম কিছু সেলফি নেই। দু একটা সেলফি ট্রাই করতে করতেই দেখি বাস স্টার্ট দিয়ে দিলো।
গন্ত্যব্য – সি পার্ল বিচ রিসোর্ট এন্ড স্পা।
এর আগে যতবারই কক্সবাজার এসেছি, প্রত্যেকবারই মূল সৈকতের আশেপাশে থাকা হয়েছে। এবার একটু ভিন্ন পরিকল্পনা ছিলো। প্ল্যানটা আসলে আমার না। আমার ছোট ভাইয়ের। সে তখন কানাডা থেকে মাসখানেকের জন্য বেড়াতে এসেছে দেশে। আমাকে বলেছিলো, এবার ইনানির দিকে থাকি। ওদিকটাতে শহরের গ্যাঞ্জাম নেই। পরিবেশ শান্ত। আর মেরিন ড্রাইভের আশপাশটা ঘুরেও দেখা হবে ভালো করে। আমিও তখন তাতে সায় জানিয়ে দিয়েছিলাম।
প্রায় ঘন্টা খানেকের ভেতর পৌঁছে গেলাম হোটেলে। ওয়েবসাইটের ছবিতে যতটা ঝকঝকে দেখাচ্ছিলো, সামনাসামনি দেখতে একটু মলিন মনে হলো আমার কাছে। প্রত্যেক রাতের জন্য এখানে যে টাকা গুনতে হচ্ছে, সেই টাকায় পাতায়া কিংবা ব্যাংককে এরচে অনেক ভালো কিছু পাওয়া যায়।
যাইহোক, আশপাশে একটু ঘুরে দেখার পর হোটেলটা বেশ ভালোই লাগলো। বেশ ছিমছাম। কোলাহোল নেই কোথাও। মাঝে মাঝে সমুদ্রের ঢেউয়ের হালকা গর্জন দূর থেকে কানে এসে মিলিয়ে যাচ্ছে।
হোটেলের চেকইনটা খুব দ্রুত হয়ে গেলো। বিকেল হতে হতেই আমারা লাঞ্চটা সেরে ফেললাম হোটেলের নিজস্ব একটা বাংলা রেস্টুরেন্টে। বলতে দ্বিধা নেই, খাবারটা ছিলো অসাধারণ।
আমি একটু বোধহয় একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছিলাম। খাবারের পর মারাত্মক ঘুম পেয়ে গেলো। ডেজার্ট হিসেবে এক বাটি সুস্বাদু ফালুদা খাওয়াটাই কাল হয়েছিলো কিনা কে জানে। নেশা নেশা চোখে হোটেলের রুমে গিয়ে পৌঁছালাম। নরম বিছানায় শরীর মেলতেই প্রায় তলিয়ে যাচ্ছিলাম ঘুমের সমুদ্রে, কিন্তু সেটা আর হলো না।
ফোন চলে এলো – সবাই নাকি রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সমুদ্র দেখবে বলে।
নিজের বউ, দুই ছেলে আর ছোট ভাইকে নিয়ে হাঁটা দিলাম সমুদ্রপারের দিকে।
হোটেলের ঠিক উল্টো দিকেই বেশ সুন্দর বিচ। কলাতলীর বিচের মতো ভিড় নেই। এদিকটাতে বেড়াতে আসা অল্প কিছু মানুষ হেঁটে বেড়াচ্ছিলো সমুদ্রপারের ভেজা বালুতে।
কিছুক্ষণের ভেতরই দেখলাম আকাশ কালচে নীল হয়ে এলো। সন্ধ্যে নেমে গেলো । আমরা হাঁটতে হাঁটতে আবার হোটেলে ফিরে এলাম।
সেই সন্ধ্যের পর যখন প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পেড়িয়ে যাচ্ছে। তখন একটা ব্যাপার আমাকে ভেতরে ভেতরে খুব অস্থির করে তুলল।
ব্যাপারটা কি বলি –
সারাদিন গায়ে সমুদ্রের বাতাস মাখছি, ফেনা ওঠা ঢেউ-এ পা ভেজাচ্ছি, রাতে হোটেলের সুইমিং পুলে পা ডুবিয়ে বসে থাকছি, রেস্টুরেন্টে গিয়ে রুপচাঁদা,লইট্টা, কোরাল, স্কুইড, লোবস্টার খাচ্ছি – কিন্তু, কোথায় যেন কি একটা নেই।
খেয়াল করে দেখলাম – কোন ভাবেই এই সমুদ্রের সাথে কেন যেন পুরোপুরি মিশে যেতে পারছি না। সমুদ্রের ঢেউ আমার হৃদপিণ্ডে এসে আছড়ে পড়ছে না।
কেন – সেটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। কোথায় আটকে যাচ্ছি, কে পেছন থেকে টেনে ধরছে আমায়।
ভাবতে ভাবতে বুঝতে পারলাম – মনের একটা অংশ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে, আরেকটা অংশ যেন তখনও ঢাকার ব্যস্ত জীবনের ভেতর আটকে আছে।
শহরের কোলাহল, ব্যস্ততা, কারণে অকারণে ছুটে চলা, বাসের হর্ন, রাস্তার হৈচৈ, ইউটিলিটি বিল, ব্যাংকের মেসেজ, অসমাপ্ত অনেক কাজের ডেডলাইন – এমন অসংখ্য ভাবনা আমাকে একটা বস্তার মধ্যে আটকে রেখেছে। আর, মন সেই যান্ত্রিক যন্ত্রণার বস্তা থেকে কিছুতেই বের হতে পারছে না।
আকাশে একটা গাংচিল উড়তে দেখলাম, আর ট্রিং করে মনে পরে গেলো ক্রেডিট কার্ডের এ মাসের বিল তো জমা দেওয়া হয়নি। এই ভাবনার ভেতরই গাংচিলটা আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। ঠিকমতো দেখাও হলো না তার রুপোলি পাখা।
ঠিক একারণেই আমাই লিখার শুরুতে বলেছিলাম স্পিডের কথা। হ্যাঁ, স্পিড।
আমাদের সবাই জীবন একটা নির্দিষ্ট স্পিডে চলতে থাকে। কারো হয়তো বেশি, কারো কম। আর আমরা নিজেদের জীবনের সেই স্পিডের সাথে সুন্দর করে তাল মিলিয়ে চলতে শিখে যাই। কিন্তু, ঝামেলা বেঁধে যায় তখন – যখন আমাদের এক স্পিড থেকে দুম করে আরেক স্পিডের ভেতর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।
যে মানুষটা শহরের ব্যস্ততার ভেতর জীবন কাটাচ্ছে, তাকে হঠাৎ করে একটা শান্ত নিরিবিলি বনের ভেতর নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হলে – সেই মানুষটা কিন্তু সাথে সাথেই বনের নিরবতা, গাছের সবুজ সতেজতা আর পাখির ডাক উপভোগ করতে পারবে না। কারণ, তার মন আর মস্তিক তখন যে গতিবেগে ঘুরছে, সেটার সাথে বনের ধীর স্থির সুর মিলবে না।
আবার ঠিক একই ভাবে, যে মানুষটা কোলাহল মুক্ত শান্ত একটা জীবনে অভ্যস্ত। তাকে যদি কোন একটা কসমোপলিটান শহরে নিয়ে আসা হয়। তখন তার মনটাও শহরের স্পিডের সাথে তাল মিলিয়ে উঠতে পারবে না। সে তখন হয়ে যাবে – অস্থির।
এসব ভাবতে ভাবতেই মেরিন ড্রাইভের টানা পথ ধরে ছুটে চলছিলাম।
সারাদিনের জন্য একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে নেয়া হয়েছিলো। সেটা করেই যাচ্ছিলাম দুপুরের খাবারের জন্য। গাড়িটা যখন রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাঁড়ালো তখন প্রায় বিকেল চারটে।
আমি মাইক্রো থেকে নেমে, রেস্টুরেন্টের সাইন বোর্ডের দিকে তাকালাম। সেখানে লিখা –
পাপা রোমা
ক্যাফে কান্ট্রি ক্লাব।
মেরিন ড্রাইভের পাশ নিয়ে বেশ অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট আছে। তবে ঠিক এটার মতো একদম বিচ সাইড রেস্টুরেন্ট আর চোখে পড়েনি। সমুদ্রের একদম ঠিক পাশেই। কাঠ দিয়ে মাচার মতো করে সেটার উপরে রেস্টুরেন্টটা বানিয়েছে।
বেশ দারুন লাগলো। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে সমুদ্রপারে এমন টাইপের অনেক রেস্টুরেন্ট দেখা যায়।
ভেতরে ঢুকে সবাই মিলে খাবার অর্ডার করে বসে রইলাম। আমার ভেতর থেকে শহুরে অস্থিরতা ভাবটা তখনো কমেনি। চোখের সামনে রোদ পড়া সোনালী সমুদ্র দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু ভেতরে কোন অনুভূতি কাজ করছে না।

একটু পরেই আমাদের অর্ডার করা খাবারগুলো চলে এলো। এমনিতেই ভীষণ ক্ষুধা লেগেছিলো, তার উপর এই রঙিন রঙিন খাবারগুলো দেখে ক্ষুধা আরও বেড়ে গেলো। আরাম করে ধীরে ধীরে খাওয়ার যে একটা সুখকর ব্যাপার আছে, আমি সেটাই তখন ভুলে গেলাম। প্লেটে নেওয়া খাবারগুলো খেয়ে শেষ করে ফেললাম প্রচণ্ড স্পিডে।

খাবার দাওয়া শেষ। এরপর কাজ হলো আয়েস করে সিগারেট খাওয়া।
এই পাপা রোমা রেস্টুরেন্টার কিছু অংশের উপর ছাউনি দেওয়া আছে। কিন্তু, বেশিরভাগ ওপেন এয়ার। একদম খোলা। মনে হয় কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো – রেলিং দেওয়া একটা ব্রিজ। একটু পর পর বসার জন্য সেখানে চেয়ার টেবিল পেতে দেওয়া আছে।
আমি একটু হেঁটে গিয়ে একটা খালি টেবিলে বসলাম। বাইরে তখন রোদের ঝাঁঝালো তাপটা কমে গেছে। সন্ধ্যে একটু একটু করে নেমে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হালকা মিষ্টি একটা নীল কমলাভা আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক হাত দূরেই সমুদ্র। বালুতটে ঢেউ ভেঙে পড়ছে, কিন্তু আমি কেন যেন এসবের সাথে থেকেও নেই।

সিগারেট ধরিয়ে আমি সমুদ্রের ঢেউগুলোকে দেখতে লাগলাম। ছোট ছোট ঢেউ। পারে এসে আছড়ে পড়ছে। আবার ফেনা ছড়িয়ে দিয়ে দূরে সরে যাচ্ছে।
আমার ঠিক সামনেই মেরিন ড্রাইভের রাস্তাটাকে বাঁচানোর জন্য বালুর বস্তা রেখে দেওয়া। বস্তাগুলোর একটু সামনে অনেকগুলো কংক্রিটের ব্লক। নদীরপার বাঁচানোর জন্য আগেকার দিনে যেমন চারকোনা রুবিক্স কিউবের মতন ব্লক ব্যবহার করা হতো, এগুলো দেখতে তেমন না। দূর থেকে দেখতে অনেকটা সিক্কা টুপির মতন লাগে। ইস্তানবুলে “সামা” নাচের সময় এমন লম্বা লম্বা সিক্কা টুপি পড়ে নাচগান হয়।
আমার সিগারেট শেষ করে গিয়েছে অনেকক্ষণ আগেই, তারপরও বসে আছি। চমৎকার বাতাস। একা একা বসে থাকতেও দারুন লাগছিলো। হঠাৎ করেই আমার নাকে সমুদ্রের নোনা ঘ্রাণ টের পেলাম। আকাশে উড়ে যাওয়া পাখিগুলো শব্দ শুনতে পেলাম। সৈকতে ঢেউ ভাঙার শব্দ আমার কানে এসে গর্জন করতে লাগলো।
মুহূর্তের মধ্যেই আমি টের পেলাম, শহরের যে ব্যস্ত জীবন আমাকে পেছনে টেনে ধরে রেখেছিলো। সেই টানটা হঠাৎ করেই ছুটে গেছে। একদম ছুটে গেছে।
প্রকৃতিকে অনুভব করার জন্য আমাদের মনকেও প্রকৃতির সুরের সাথে মিলিয়ে নিতে হয়। অশান্ত মন, বিক্ষিপ্ত চিন্তা কিংবা দুশ্চিন্তা নিয়ে আমরা হয়তো চোখ দিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে পারি। কিন্তু, সেটা মন দিয়ে অনুভব করা সম্ভব না। মন দিয়ে অনুভব করতে চাইলে, নিজের মনটা কেউ প্রকৃতির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়।
তাই, আমার যেটা মনে হয় – কোথাও বেড়াতে গেলে, নিজের মনকে কিছুটা সময় দেয়া দরকার সেই জায়গার স্পিডের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। প্রকৃতি, পরিবেশ, আবহাওয়া যত দ্রুত আপন করে নেওয়া যাবে, সেই জায়গা তত দ্রুত আমাদের আপন করে নেবে।
আর এই আপন করে নেওয়ার জন্য, যেটা দরকার সেটা হচ্ছে – আগের পরিবেশের পোশাক সম্পূর্ণ খুলে ফেলা। তাহলেই, মন – নতুন জায়গাকে, নতুন পরিবেশকে, নতুন মানুষকে আপন করে নেবে।
.
সেদিন আমারা পাপা রোমা থেকে আর অন্য কোথাও যাইনি।
আমার দেরি দেখে ছোটভাই আর বউ-বাচ্চারাও চলে এসেছিলো সেই খোলা ডেকে।
খোলা আকাশের নিচে, সমুদ্রের বাতাসের আদর গায়ে মেখে আমরা ওখানেই বসেছিলাম। চা কফি খেতে খেতে আড্ডা দিয়ে যখন হোটেলে ফিরে এলাম তখন রাত প্রায় দশটা।
.

আমার মনে হয় কেউ কক্সবাজার বেড়াতে গেলে এখানে একটা সন্ধ্যা এখানে বসে কাটিয়ে আসতে পারেন। সন্ধ্যাটা হয়তো সুন্দর ভাবে কেটে যেতে পারে।


